কেউ কি আসলেই আপনার কথা শুনছে? চোখের পলক গুনেই জেনে নিন গোপন সত্য!
আমরা প্রতিনিয়ত চোখের পলক ফেলি। এটি আমাদের চোখের সুরক্ষার জন্য একটি অপরিহার্য এবং অনেকটা স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়া। সাধারণত মিনিটে আমরা কতবার চোখের পলক ফেলছি, তা নিয়ে আমরা খুব একটা ভাবি না।

কিন্তু সাম্প্রতিক একটি গবেষণার ফলাফল জানলে আপনি হয়তো এখন থেকে নিজের এবং অন্যদের চোখের পলকের দিকে একটু বাড়তি নজর দেবেন।
কানাডার একদল গবেষক দাবি করছেন, চোখের পলক ফেলার সাথে আমাদের মস্তিষ্কের মনোযোগ এবং শোনার গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
কেউ যখন আপনার কথা খুব মনোযোগ দিয়ে শোনেন, তখন তাদের চোখের পলক পড়ার হার কমে যায়। বিশেষ করে আশেপাশে যদি কোলাহল থাকে, তখন এই হার আরও কমে আসে।
গবেষণার নেপথ্যে: মনোযোগের সাথে পলকের সম্পর্ক

মন্ট্রিলের কনকর্ডিয়া ইউনিভার্সিটির সাইকোলজি বা মনোবিজ্ঞান বিভাগের গবেষক পেনেলেপ কুপাল এবং তার দল এই বিষয়টি নিয়ে একটি গভীর গবেষণা চালিয়েছেন। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল পরিবেশগত বিভিন্ন বিষয় (যেমন আলো বা শব্দ) কীভাবে আমাদের চোখের পলক ফেলার ওপর প্রভাব ফেলে তা জানা।
কুপাল বলেন, “আমরা জানতে চেয়েছিলাম, কেউ যখন কথা শোনে তখন কি কোনো নির্দিষ্ট কৌশল মেনে পলক ফেলে, যাতে কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিস না হয়? নাকি এটি শুধুই একটি শারীরিক প্রক্রিয়া?”
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গবেষকরা ৪৯ জন স্বেচ্ছাসেবকের ওপর দুটি ভিন্ন পরীক্ষা চালান। এই পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের বিভিন্ন বাক্য শোনানো হয় এবং সেই সময়ে তাদের চোখের পলক পড়ার সংখ্যা রেকর্ড করা হয়।
পরীক্ষাটি কীভাবে করা হয়েছিল?

গবেষণায় দুটি মূল বিষয় পরিবর্তন করে দেখা হয়েছিল:
- আলোর তীব্রতা: কখনো আলো কমানো হয়েছে, কখনো বাড়ানো হয়েছে।
- ব্যাকগ্রাউন্ড নয়েজ বা কোলাহল: কথা শোনার সময় পেছনের শব্দ বাড়িয়ে বা কমিয়ে শোনার কাজটি কঠিন বা সহজ করা হয়েছে।
ফলাফলে দেখা গেছে, যখনই স্বেচ্ছাসেবকরা কোনো বাক্য মনোযোগ দিয়ে শুনছেন, তখনই তাদের চোখের পলক পড়ার হার স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে কমে গেছে। অর্থাৎ, কথা বলার আগে বা পরে তারা যতবার পলক ফেলছিলেন, কথা শোনার সময় তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, যখন ব্যাকগ্রাউন্ডে কোলাহল বা নয়েজ বাড়িয়ে দেওয়া হলো (অর্থাৎ কথাটা শুনতে মস্তিষ্কের বেশি জোর লাগছিল), তখন চোখের পলক পড়ার হার আরও কমে গেল।
অন্যদিকে, আলোর তীব্রতা কম-বেশির কারণে পলক ফেলার হারে তেমন কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। এর মানে হলো, চোখের ওপর আলোর চাপের কারণে নয়, বরং কথাটি বুঝতে মস্তিষ্কের যে ‘কগনিটিভ লোড’ বা মানসিক চাপ পড়ে, তার কারণেই মানুষ পলক কম ফেলে।
শব্দ যখন মস্তিষ্ককে ব্যস্ত রাখে

ব্যক্তিভেদে চোখের পলক পড়ার স্বাভাবিক হার ভিন্ন হতে পারে। কিন্তু এই গবেষণায় দেখা গেছে, যখনই শোনার জন্য মনোযোগ দিতে হচ্ছে, তখন দলমত নির্বিশেষে সবারই পলক ফেলার প্রবণতা কমে যাচ্ছে।
আগের বিভিন্ন গবেষণার সাথে এই ফলাফলটি মিলে যায়। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, যখন আমাদের মস্তিষ্ক কোনো শব্দ বা কথা বোঝার জন্য কঠোর পরিশ্রম করে, তখন আমরা অজান্তেই চোখের পলক ফেলা কমিয়ে দিই।
কুপাল বলেন, “আমরা এলোমেলোভাবে চোখের পলক ফেলি না। যখন কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আমাদের সামনে আসে, তখন আমরা নিজেদের অজান্তেই পলক ফেলা কমিয়ে দিই।”
পলক কেন কমে যায়? বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা

গবেষকরা পুরোপুরি নিশ্চিত নন কেন চিন্তা বা মনোযোগের সাথে পলকের এই সম্পর্ক, তবে তাদের কাছে কিছু জোরালো তত্ত্ব আছে।
কনকর্ডিয়া ইউনিভার্সিটির আরেক গবেষক এবং অ্যাকোস্টিক ইঞ্জিনিয়ার মাইকেল ডেরোশ বলেন, “আমাদের গবেষণা বলছে, চোখের পলক ফেলার অর্থ হলো ক্ষণিকের জন্য তথ্য হারিয়ে ফেলা—তা দৃশ্যমান হোক বা শ্রবণযোগ্য। সম্ভবত এই কারণেই যখন গুরুত্বপূর্ণ কোনো তথ্য আমাদের দিকে আসে, মস্তিষ্ক চোখের পলক আটকে রাখে যাতে মনোযোগে কোনো ব্যাঘাত না ঘটে।”
সহজ কথায়, চোখের পলক ফেলা মানে মস্তিষ্কের জন্য একটি ছোট্ট ‘বিরতি’ বা পজ (Pause)। যখন মস্তিষ্ক কোনো কথা প্রসেস করতে বা বুঝতে ব্যস্ত থাকে, তখন সে এই বিরতি নিতে চায় না। তাই গভীর মনোযোগের সময় চোখের পলক কমে যায়।
ভবিষ্যতের সম্ভাবনা: চোখের ভাষায় মস্তিষ্কের খবর

গবেষক দলটি মনে করছে, ভবিষ্যতে চোখের পলক ফেলার এই প্যাটার্ন দেখে মানুষের ‘কগনিটিভ লোড’ বা মস্তিষ্কের কাজের চাপ মাপা সম্ভব হবে। একজন মানুষের মস্তিষ্ক কখন খুব ব্যস্ত, বা তার বোঝার ক্ষমতায় কোনো সমস্যা হচ্ছে কি না—তা হয়তো শুধু চোখের দিকে তাকিয়েই বলে দেওয়া যাবে। যেভাবে এখন কথা বলা বা শোনার পরীক্ষা করা হয়, ভবিষ্যতে চোখের পলকও হতে পারে রোগ নির্ণয়ের একটি মাধ্যম।
তবে এই বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য আরও অনেক তথ্যের প্রয়োজন। ডেরোশ বলেন, “বিষয়টি পুরোপুরি প্রমাণ করতে আমাদের আরও জানতে হবে যে, চোখের একটি পলকের সেই সামান্য সময়ে ঠিক কতটুকু দৃশ্যমান বা শ্রবণযোগ্য তথ্য হারিয়ে যায়। এটিই আমাদের গবেষণার পরবর্তী ধাপ।”
সুতরাং, পরের বার যখন কেউ আপনার সাথে কথা বলবে, খেয়াল করে দেখুন তো – তারা কি ঘন ঘন পলক ফেলছে, নাকি একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে? যদি পলক কম পড়ে, তবে বুঝবেন—তারা সত্যিই আপনার কথা মন দিয়ে শুনছে!
লেখাটি ভালো লেগে থাকলে আমাকে ফেসবুকে অনুসরণ করতে পারেন। এছাড়াও আমি টুইটারে এবং ইন্সটাগ্রামে সক্রিয় আছি।
মন্তব্য করুন