রেজিষ্ট্রেশন করুন

লগইন করুন

Lost Password

Lost your password? Please enter your email address. You will receive a link and will create a new password via email.

লগইন করুন

রেজিষ্ট্রেশন করুন

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipiscing elit.Morbi adipiscing gravdio, sit amet suscipit risus ultrices eu.Fusce viverra neque at purus laoreet consequa.Vivamus vulputate posuere nisl quis consequat.

সিঁড়ি — মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়

একতলার উত্তর প্রান্ত থেকে দোতলা আর তিনতলার মধ্যস্থতা অতিক্রম করে সিঁড়িটা তেতলার খোলা ছাদে গিয়ে পৌঁছেছে। এই সিঁড়ি বেয়ে খোলা ছাদে পৌঁছানোর জন্যে সাধারণ নিয়মে চৌষট্টিবার একটি পায়ের জোরে মাধ্যাকর্ষণের বিরোধিতা করতে হয়। তবে সাধারণ নিয়ম সকলের জন্য নয়। এমন মানুষও জগতে আছে যারা সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠবার সময় দুটো তিনটে ধাপ একেবারে ডিঙিয়ে যায়। এরা মানুষ হয়েও ঠিক মানুষ নয়,—মহামানব। মহামানব এইজন্যে যে এ জগতে মহামানবী নেই, কারণ মেয়েরা কোনোদিন দুটো তিনটে ধাপ ডিঙিয়ে ওপরে ওঠে না। ক্ষমতাও নেই, বাধাও আছে।

চৌষট্টি ধাপের সিঁড়িটাকে ঢাকা দেবার ছাদটুকুর উপরে পাতলা দেয়াল আর টিনের চালের একটি চিলেকুঠি আছে এ বাড়িতে। পথ থেকে বাড়ির ভিটেয় উঠবার জন্য আর একতলার বারান্দা থেকে উঠানে নামবার জন্য এ বাড়িতে ধাপের ব্যবস্থা মোটে একটি করে; কিন্তু চিলেকুঠিতে ওঠানামার জন্য ধাপ আছে দুটি, তাই এও একটা সিঁড়ি। দুটি একের সমষ্টি যখন দুই এবং ধাপের সমষ্টি মাত্রেই সিঁড়ি, চিলেকুঠিটিকে সিঁড়ি থাকার গৌরব না দিয়ে উপায় নেই।

চৌষট্টি ধাপের সিঁড়িটিকে বাড়ির ছায়াই শীতল করে রাখে, চিলেকুঠির সিঁড়ি কিন্তু চিলেকুঠির ছায়া পায় শেষ বেলায়, গ্রীষ্মকালেও সূর্য যখন নিস্তেজ। মেঘলা দিন বাদ দিয়ে শীতের দুমাস পরেও দুপুরবেলা চিলেকুঠিটি হয়ে থাকে শীতার্ত মানুষের স্বর্গ আর সিঁড়িটি হয়ে থাকে আগুন। শীতগ্রীষ্ম নির্বিশেষে যে শীতার্ত, তারও পায়ের পাতা পুড়িয়ে দেয়।

ডান পায়ের চেয়ে ইতির বাঁ পা-টি লম্বায় প্রায় এক ইঞ্চি ছোট। হ্রস্ব পা-খানি প্রথম ধাপে নামিয়েই সে তুলে নেয়। ব্যাপারটা মানবকে ভালো করে বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য দাঁতের ফাঁকে সজোরে শব্দ করে, ‘ইস!’

মানব বলে, ‘গরম বুঝি?’

ইতি বলে, ‘আগুন হয়ে আছে।’

ঘরে কুঁজোয় জল ছিল, একতলা থেকে মানবের নিজের বয়ে আনা জল। কুঁজো কাত করে মানব সিঁড়িতে জল ঢেলে দেয়। যতক্ষণ সে জল ঢালতে থাকে ইতি কথা বলে না, সবটুকু জল মানব ঢেলে দেয় কি না দেখবার জন্য চুপ করে থাকে। কুঁজো খালি হয়ে গেলে মানবের হাত চেপে ধরে বলে, ‘সব জল ঢেলে দিলে? একটু খেতাম আমি, তেষ্টা পেয়েছে।’

‘এতক্ষণ খাও নি কেন?’

‘এতক্ষণ কি মনে ছিল? জল দেখে খেয়াল হল।’

মানব একটু হাসে। চল্লিশ বছরের পুরোনো মুখখানায় সাত দিনের দাড়িগোঁফ জমেছে, বাঁ দিকের গালটি কবে যেন চিরে সেলাই করে দেওয়া হয়েছিল। ঘাম মুছে মুছে মাজা বাসনের মতো কপাল চিকচিক করছে। তামাকের ধোঁয়ায় ঠোঁট দুটি কালো। দাঁতে আর মুখে বেহিসেবি পান খাওয়ার ইতিচিহ্ন। শান্ত নির্মল হাসিটুকু তাই আরো অপূর্ব মনে হয়,—ইতির মুখও সলজ্জ হাসিতে ভরে যায়, ব্রণের ছোট ছোট গর্তভরা দুটি গালেই টোল পড়ে সৃষ্টি হয় দুটি বড় গহ্বরের।

মানব বলে, ‘চলো নিচে যাই। তুমি জল খাবে আমি কুঁজোটা ভরে নিয়ে আসব।’

ইতি বলে, ‘তোমার তেষ্টা পায় নি?’

মানব বলে, ‘পাবে পাবে, ভাবছ কেন?’

ধাপ দুটি ভাসিয়ে কুঁজোর জল ছাদে তিনটি ধারায় ভাগ হয়ে গিয়েছিল, নালির কাছাকাছি একসঙ্গে মিলে এতক্ষণে নালি দিয়ে নিচে ঝরে পড়তে আরম্ভ করেছে। সমস্ত ছাদে শুকনো শ্যাওলা, আর কয়েকটি দুপুরের রোদ পেলেই আলগা হয়ে উঠে জাগবে আর সন্ধ্যার পর মানবের পায়চারিতে গুঁড়ো হয়ে যাবে। কুঁজো হাতে এক ধাপ নেমেই বোধ হয় আগামী সন্ধ্যায় নিজের পায়চারি করার দৃশ্যটা কল্পনায় ভেসে ওঠে মানবের, মুখ ফিরিয়ে সে জিজ্ঞাসা করে, ‘সন্ধ্যার সময় আসবে একবার?’

‘না এলে রাগ করবে?’

‘রাগ? আর কি তোমার ওপর রাগ করতে পারি? এবার থেকে অভিমান করব।’

‘তা হলে আসব না।’

মানব খুশি হয়ে বলে, ‘সেই ভালো। আজ একা একা তারা গুনে অভিমান করব, কাল তুমি এসে আমার অভিমান ভাঙাবে। আমার এমন ছেলেমানুষি করতে ইচ্ছে করছে ইতি! কী রকম যে লাগছে আমার কী বলব!’

‘আমারও।’

দৃষ্টির একটু গভীরতা এসেছে বৈকি মানবের, মনটি তো অন্তত শান্ত হয়েছে। দুজনেই যখন ছাদে নেমেছে, সে হঠাৎ ব্যাকুলভাবে জিজ্ঞাসা করল, ‘তোমার কষ্ট হচ্ছে না তো ইতি?’

‘না গো, না। কিসের কষ্ট?’

সন্ধ্যার পর না এসে ইতি তাকে অভিমান করার সুযোগ দেবে, পরামর্শ হচ্ছে এই। এখনই যেন মানবের অভিমান হয়, মুখখানা গম্ভীর করে সে বলে, ‘তোমার চেয়ে আমি অনেক বড় কিনা, তাই বলছি।’

‘আমিই বা কী এমন আকাশের পরী!’

অভিমান গাঢ় হয়; মানবের চোখ পর্যন্ত যেন ছলছল করে।

‘আকাশের পরী হলে তুমি আমার দিকে তাকিয়েও দেখতে না তো?’

‘কী ছেলেমানুষ তুমি।’

আকাশে রোদ, ছাদ গরম। আবার মানবের মুখ হাসিতে ভরে যায়, ইতির কাঁধে মুখ রেখে কথা বলতে গিয়ে কিছু না বলাই সে ভালো মনে করে। কথা বলার চেয়ে কঠিন হাসি হেসে ইতিকে তাই হাসির জবাব দিতে হয়। এ কী আশ্চর্য যে নিচে নামবার কথা ভুলে যাওয়ার মতো ভঙ্গিতে দুজনে কয়েক মুহূর্তের জন্যও দাঁড়িয়ে থাকতে পারে? পায়ের তলার ছাদটুকু ছাড়া আর সব যেন অনাবশ্যক হয়ে গেছে। অনেক উঁচুতে এই ছাদ—দামি একটা হাউই পৃথিবী ছেড়ে যত উঁচুতে উঠতে পারে হয়তো তত উঁচুতে নয়, কিন্তু কে আর সে আপেক্ষিক তত্ত্ব প্রমাণ করতে বসবে দামি হাউই ছেড়ে? আশপাশের বাড়িগুলো তো এত উঁচু নয়, এ বাড়ির মতো ইট বের করা নয় বলে কেবল দেখতে সুন্দর। কিন্তু সেটুকুও এ বাড়ির ছাদে যারা দাঁড়িয়ে থাকে তাদেরই ভালো লাগে, চোখ মেললেই সমগ্রভাবে চোখে পড়ে। তা ছাড়া পাওয়া যায় আচ্ছন্ন, অভিভূত হওয়ার একটা অতিরিক্ত ক্ষমতা।

‘ইস।’

এবার মানবের চমক লাগে।

‘গরম বুঝি?’

‘আগুন হয়ে আছে।’

মানব আফসোস করে বলে, ‘তোমাকে আজ খালি কষ্ট দিচ্ছি।’

‘দিচ্ছই তো। খালি খালি কষ্ট দেওয়ার কথা বলছ।’

চৌষট্টি ধাপের সিঁড়ির ছায়াতে নেমে যাওয়া মাত্র দুজনে যেন আশ্চর্য হয়ে পরস্পরের মুখের দিকে তাকায়। মানব বলে, ‘সিঁড়িটা তো বেশ ঠাণ্ডা!’

ইতি সান্ত্বনা দিয়ে বলে, ‘গরম থেকে এলে কিনা। এতক্ষণ কিন্তু বুঝতেই পারি নি তোমার ঘরটা কী গরম।’

ধীরে ধীরে ইতি নামতে থাকে, প্রতি মুহূর্তে এলিয়ে পড়তে চাওয়ার মতো অলস অনিচ্ছুক পদে। সিঁড়ির মুখের কাছে তাপ ও আলো মেশার ফলে ছায়া একটু কম শীতল, কম ম্লান, প্রত্যেক ধাপ নামার সঙ্গে যেন বুঝতে পারা যায় ছায়া গাঢ় হচ্ছে, শীতলতা বাড়ছে। কিন্তু এই গরমে কোনো ছায়াই এমন শীতল হতে পারে না যে একটু আরাম দেওয়ার বেশি কিছু দিতে পারবে, ইতি কিন্তু একবার শিউরে ওঠে, জ্বরের রোগীর গায়ে কেউ যেন হঠাৎ বরফের ছেঁকা দিয়েছে।

তেতলার বারান্দায় বছরখানেকের ছেলে কোলে একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। ছেলেটি চুষছিল চুষিকাঠি আর মেয়েটি চুষছিল ছেলেটির গোটা তিনেক আঙুল। সিঁড়ির মাঝামাঝি বাঁকের ধাপটি একটু প্রশস্ত, সেখানে দাঁড়িয়ে ইতি শিহরনটুকু সামলায়, তারপর ফিরে যাওয়ার উপক্রম করে, কিন্তু উপক্রম করেই ক্ষান্ত হয়। ছুটে পালানোর এই আকস্মিক প্রেরণার জন্যই বোধ হয় মুখখানা একটু অপ্রসন্ন ও ক্লিষ্ট হয়ে ওঠে, ততক্ষণে মানবও এদিকে ভদ্রতা করে ফেলেছে।

‘মায়ে-পোয়ে কী হচ্ছে?’

মেয়েটি মাথার কাপড় তুলে দেয়, মুখ থেকে ছেলের আঙুল খসে পড়ে। অনাবশ্যক নীরবতার সঙ্গে খানিকক্ষণ ইতির দিকে চেয়ে থেকে বলে, ‘এমনি দাঁড়িয়ে আছি।’

‘নরেন আজ কখন আপিস চলে গেল, জানতেও পারি নি।’

‘উনি ভোরবেলা বেরিয়ে গেছেন, আমার বোনের বাড়ি হয়ে আপিস যাবেন। আজ ধীরেসুস্থে রান্নাবান্না করেছি, একেবারে রাঁধবই না ভেবেছিলাম, হঠাৎ আমার দেওর এসে পড়ল কিনা, তাই রেঁধেছি। রেঁধেবেড়ে না খাওয়ালে নিন্দে করত তো? গিয়ে বলত, ভাইকে তো পর করেইছি, বাড়িতে এলে একবেলা খেতেও বলি না,—এই মাত্র চলে গেল। কেন এসেছিল জানেন? টাকা চাইতে! এদিকে আমার নিন্দে ছাড়া মুখে কথা নেই, দাদাকে বাড়ি না পেয়ে আমার কাছে দিব্যি দশটা টাকা চেয়ে বসল। আমি বললাম আমি টাকা কোথায় পাব, দাদার কাছ থেকে নেবেন।—তুই ছাতে কী করছিলি ইতি?’

ইতি বলে, ‘বাড়ি ভাড়া দিতে গিয়েছিলাম। মা বললে, ভাড়ার টাকাটা দিয়ে আয় তো ইতি, সেই জন্য।’

ছেলের ভার ডান হাত হতে বাঁ হাতে গ্রহণ করে আবার মেয়েটি অনাবশ্যক নীরবতার সঙ্গে ইতির দিকে খানিকক্ষণ চেয়ে থাকে, তারপর হঠাৎ একটা ভুলে যাওয়া কথা মনে পড়বার ভঙ্গিতে বলে, ‘ও, হ্যাঁ—আমাদের ভাড়ার টাকাটাও তো দেওয়া হয় নি। কী করেই বা দেব, কাল তো মোটে মাইনে পেলেন। আজ দিতে বলে গেছেন। একটু দাঁড়ান, টাকাটা এনে দিই, কেমন? খোকাকে একটু ধরবি ভাই ইতি?’

ইতির কোলে ছেলে দিয়ে আঁচলে বাঁধা চাবির গোছায় বার কয়েক ঝনাৎ করে শব্দ তুলে ঘরের ভিতরে মেয়েটি বাক্স খোলে। গোটা দুই বাক্স মোটে তার সম্পত্তি কিন্তু চাবির গোছায় চাবি যেন আঁটে না, আঁচল ছিঁড়ে পড়তে চায়। বাক্স খোলা আর বন্ধ করতেও কত যে অনাবশ্যক শব্দের সে সৃষ্টি করে বলবার নয়।

মানব নিচু গলায় ইতিকে জিজ্ঞাসা করে, ‘তোমাদের ভাড়া দিতে এসেছিল নাকি?’

ইতি বলে, ‘না, ওর কাছে একটা কৈফিয়ত দিতে হবে তো?’

ইতিকে খোকা অনেকদিন থেকে চেনে, প্রায় আজন্ম। কিন্তু ইতি কোনোদিন তার হাতের আঙুল মুখে পুরে চোষে না বলেই বোধ হয় ইতির কোলে থাকতে তার ভালো লাগে না। চুষিকাঠিটা প্রথমে নিচে পড়ে যায়, এদিক ওদিক চেয়ে খোকা মুখ বাঁকায়, তারপর মানব তার গালে একটা টোকা দেওয়া মাত্র সে কাঁদতে আরম্ভ করে।

বাক্সে চাবি দিতে দিতে মেয়েটি আনন্দে গদগদ হয়ে বলে, ‘আসছি রে আসছি, দুষ্টু কোথাকার। এক মিনিট আমায় ছেড়ে থাকতে পারবি না, আচ্ছা ছেলে হয়েছিস তো তুই!’

ভাড়ার টাকা, স্বামীর লিখে রাখা রসিদ আর এক কলম কালি নিয়ে খোকার মা বারান্দায় আসে, মানবকে টাকা গুনে দিয়ে রসিদে তার সই নেয়, তারপর ছেলেকে কোলে করে বলে, ‘এত টাকা ভাড়া তো পান, কী করেন টাকা দিয়ে? সমস্ত বাড়িটা ভাড়া দিয়ে এই গরমে একা একা চিলেঘরে কী করে থাকেন আপনি? আমি হলে তো পারতাম না।’

মানব ভাড়ার টাকা কোমরে গুঁজে বলে, ‘না পেরে উপায় কী, খোকার বাবার মতো আমি তো চাকরি করি না।’

খোকার মা চোখ বড় বড় করে বলে, ‘আপনার আবার চাকরি! এক মাসে আপনি যা সুদ পান, ওঁর মাইনের তা কগুণ কে জানে! একটু শুইগে খোকাকে নিয়ে, ঘুমিয়ে পড়ে তো তোকে ডাকব ইতি। পাখিটার ঠোঁট আর পা দুটো ভালো হচ্ছে না একটু দেখিয়ে দিস। কটি করে ঘর বুনতে বলেছিলি ভুলে গেছি ভাই, যা দুষ্টুমি করে খোকা!’

মানব বলে, ‘আরেকজন দুষ্টুমি করে না?’

‘করে না?’—ফিক করে হেসে ফেলে পাক দিয়ে ঘুরেই খোকার মা ঘরের ভিতরে চলে যায়। কুঁজোটা তুলে নিয়ে মানব সিঁড়ির এক ধাপ নেমে গিয়ে দাঁড়ায়। মুখ ফিরিয়ে বলে, ‘এসো, দাঁড়িয়ে রইলে কেন?’

ইতি নীরবে আসে। সমতল বারান্দায় ছোট-বড় পা নিয়ে চলার ভঙ্গিটি তার বেশ। অন্য সব মেয়ে যেন শুধু চলে। ইতি একটা অজানা ছন্দে দুলে দুলে চলে। কোলে ছেলে নেই ইতির, আঁচলে নেই চাবির ভার, তবু বুকে পিঠে কাঁখে ছেলে যেন আছে তার অনেকগুলি, আঁচলে বাঁধা আছে সে যত ভার বইতে পারে না তার চেয়ে বেশি ভারি চাবির গোছা।

সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে মানব বলে, ‘তোমাদের পাঁচ মাসের ভাড়া বাকি আছে।’

‘হ্যাঁ।’

মানব রসিকতা করে বলে, ‘অন্য কোনো ভাড়াটে হলে কবে তুলে দিতাম।’

‘হ্যাঁ।’

‘রাগ হল নাকি, ভাড়ার কথা বললাম বলে?’

‘না, না, রাগ কিসের?’

সিঁড়ি বেয়ে তেতলায় নামার শিথিল এলায়িত ভঙ্গি এখন দোতলায় নামার সময় স্খলিত পদে নামার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে গেছে। নামাও যেন কম পরিশ্রমের কাজ নয়।

মানব মুখ ভার করে বলে, ‘অত হিসেব করে কথা বলা আমার আসে না। যা মনে আসে বলে ফেলি। কী এমন বললাম যে তোমার মুখ ভার হয়ে গেল?’

ইতি একটু হাসে। হাসলে মুখের ভার হালকা হয়।

‘মুখ আবার ভার হল কোথায়? কী ছেলেমানুষ তুমি! তোমার কথায় কি আর মুখ ভার করেছি, মুখ ভার করেছি তেতলার ওই লক্ষ্মীছাড়ির কথায়। খোকার বাবা তো এদিকে মাইনে পায় তেষট্টি টাকা, অহঙ্কারে যেন ফেটে পড়ছে!’

সুতরাং মানবও হাসে। ইতির কথায় স্ত্রী-চরিত্রের একটি স্থূল দিক ফুটে উঠেছে আর নিজের সূক্ষ্ম বুদ্ধি দিয়ে সেটা ধরতে পেরেছে বলে গর্ব আর আমোদ অনুভব করে। ইতিকে নাড়া দিয়ে স্ত্রী-চরিত্রের আরো দুটো দিক আবিষ্কারের আশায় বলে, ‘কেন, নরেশের বৌ বেশ লোক।’

‘বেশ না ছাই। সুখে আছে তাই, আমার মতো পোড়াকপাল তো নয়।’

‘তোমার পোড়াকপাল নাকি?’

দুজনেই থমকে দাঁড়ায়। ইতি পিছনে হেলে যায় সাপের ফণা ধরার মতো, বলে, ‘কী বলছেন?’

মানব গম্ভীর হয়ে বলে, ‘তোমার পোড়াকপাল বলছ, আমার জন্য তো?’

সাপের ফোঁস করার মতোই ইতি সজোরে নিশ্বাস ছাড়ে, কিন্তু ছোবল মারার বদলে বয়স্কা নারীর চিরন্তন ক্ষমা করা আর প্রশ্রয় দেওয়ার ভঙ্গিতে বলে, ‘তোমার সঙ্গে আর পারলাম না। মা বাবা ভাই বোনেদের কথা ভেবে ও কথা বলেছি, কী কষ্টে আছে সবাই বলো তো? নইলে, আমি তো আজ রাজরানী। অবিশ্যি, দেখতে শুনতে রাজরানী নই, তোমার জন্যে রাজরানী।’

তেতলায় মানুষ আছে, দোতলায় মানুষ আছে, সিঁড়িতে আর কেউ নেই—তবু ইতি জোর করে গলা একেবারে খাদে নামিয়ে দেয়। বলে, ‘তুমি আমার রাজা।’

দুজনে দোতলায় নামামাত্র উপরের যে ঘরটিতে খোকাকে নিয়ে খোকার মা শুতে গেছে ঠিক তার নিচের ঘর থেকে বার হয়ে আসে মাঝবয়সী একটি মহিলা। মহিলাটি এত মোটা যে পদক্ষেপে মেঝে না কাঁপলেও দুমদাম শব্দ হয়। তবে এখন পা ফেলার শব্দটা তার একটু জোরালো, হয়তো একটু বেশি জোরেই সে এখন পা ফেলছে।

‘কোথায় ছিলি ইতি?’

‘তেতলায় ছিলাম, খোকার মার কাছে।’

‘ছাই ছিলি, তিনবার ওপরে নিচে তোকে খুঁজে এসেছি।’

‘তখন হয়তো চিলেঘরে গেছলাম। মা বললে, ভাড়ার টাকাটা দিয়ে আয় তো ইতি, সেইজন্য। এতক্ষণ তো খোকার মার সঙ্গে গল্প করছিলাম, জিজ্ঞেস করে আয় খোকার মাকে। খোকার মার সঙ্গে গল্প করছিলাম না মানববাবু?’

মানব বলে, ‘করছিলে বৈকি।’

ইতি আবার জিজ্ঞাসা করে, ‘আপনি বললেন না কুঁজোয় জল ফুরিয়ে গেছে? আমি বললাম না, চলুন নিচে গিয়ে কুঁজোতে জল ভরে দিচ্ছি?’

মানব মাথা নেড়ে সায় দেয়।

মোটা মেয়েটির রং খুব ফরসা! এতক্ষণ মুখখানা তার লাল হয়েছিল, এবার ধীরে ধীরে লালচে ভাবটা কমে যেতে আরম্ভ করে। খানিকক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে আরো জোরে দুমদাম পা ফেলে সে ঘরে গিয়ে ঢোকে, দরজা বন্ধ করে দড়াম করে খিল তুলে দেয়।

পরক্ষণে খিল খুলে আবার বের হয়ে আসে।

‘তুই মর ইতি, মর তুই, গোল্লায় যা। পা না তোর খোঁড়া? খোঁড়া পায়ে তুই না সিঁড়ি ভাঙতে পারিস না? সিঁড়ি ভাঙতে পারিস না তো, যমের বাড়ি যাস না কেন তুই?’

মানব বলে, ‘সুধা, আজ হাসপাতালে যাও নি?’

সুধা বলে, ‘দেখতে পাচ্ছ না, যাই নি?’

মানব আবার বলে, ‘আজ ডিউটি নেই বুঝি?’

সুধা হঠাৎ কাঁদ-কাঁদ হয়ে বলে, ‘ডিউটি থাক বা না থাক, তোমার কী?’

মানব শান্তভাবে বলে, ‘না, এমনি বলছি। ভাড়ার টাকা দেবে নাকি আজ কিছু?’

সুধা স্তব্ধ হয়ে যায়। চোখের চারদিকের অতিরিক্ত মাংস ফেলে ছোট ছোট চোখ দুটিকে বড় করবার চেষ্টা করে।

‘ভাড়া চাইছ? ভাড়া!’

মানব মৃদু একটু হেসে বলে, ‘তুমিই তো বলেছিলে আজ কিছু দেবে।’

‘এখনো মাইনে পাই নি।’

‘বেশ মাইনে পেলে দিও। নগেনকে ফিরে আসবার জন্যে খুব বিজ্ঞাপন দিচ্ছ, না সুধা?’

সুধা মুখ সাদা করে বলে, ‘কে বলে বিজ্ঞাপন দিচ্ছি?’

‘কাগজে দেখলাম। বেশ বিজ্ঞাপন দিয়েছ, ছেলেমেয়েদের নিয়ে একা আর কতকাল চালাব, আমার জন্যে না হোক ওদের কথা ভেবে ফিরে এসো, ইতি তোমার সুধা। তোমার বিজ্ঞাপন যদি চোখে পড়ে সুধা, যেখানে থাক নগেন ছুটে আসবে।’

সুধা আর কথা বলে না, আবার ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয়। এবার তার পদক্ষেপের শব্দও হয় কোমল, দরজা বন্ধ করার শব্দও হয় মৃদু।

সিঁড়ি দিয়ে নামতে আরম্ভ করে ইতি বলে, ‘সিঁড়ি যেন আর ফুরোতে চায় না।’

‘কষ্ট হচ্ছে?’

‘থাক, আর দরদ দেখিয়ে কাজ নেই। সুধাদির কমাসের ভাড়া বাকি আছে?’

‘কমাস আবার, দু-এক মাস। কী করবে বলো বেচারি, চারটি ছেলেমেয়ে নিয়ে চারদিকে অন্ধকার দেখছে। নার্সগিরিতে কি পয়সা আছে?’

‘তুমি দেও না কেন?’

‘আমি কেন দেব? আমার সঙ্গে কী সম্পর্ক? আর দু-মাস দেখব, ভাড়া যদি না মেটায়, পষ্ট বলে দেব বিনা ভাড়ায় যে বাড়িতে থাকতে পাবে সেখানে থাকো গে, আমার এখানে ওসব চলবে না।’

সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় নামার স্খলিত ভঙ্গি ইতির এবার নিজের হঠাৎ মুচড়িয়ে ভেঙে পড়বার ভঙ্গিতে পরিণত হয়ে গেছে। কিন্তু এদিকে সিঁড়িও ফুরিয়ে আসছে, প্রাণপণ চেষ্টায় মানবের বাহুমূলে আস্তে একটি চড় মেরে মৃদু হেসে সে তাই বলে, ‘কী দুষ্টুই তুমি ছিলে!’

তেতলায় খোকার মা খোকাকে যেমন করে দুষ্টু বলেছিল, ঠিক তেমনি করে বলে! তারপর আচমকা জিজ্ঞাসা করে, ‘কই দিলে না?’

মানব বলে, ‘কী?’

‘মা যে দশ টাকা ধার চেয়েছে? ভাড়ার টাকা তো পেলে, তাই থেকে দাও না?’

মানব মৃদু হেসে কোমরের গোঁজা টাকা বার করে ইতিকে দশটা টাকা দেয়। ইতি ঘাড় গুঁজে নামতে থাকে।

একতলার বারান্দায় নেমে দেখা যায় : বারান্দায় মাদুরে বসে দেয়ালে ঠেস দিয়ে ইতির মা ঘুমোচ্ছে, পাশে পড়ে আছে বছর তিনেকের একটা উলঙ্গ ছেলে, সর্বাঙ্গে তার অনেকগুলি পাঁচড়া। বারান্দার অপর প্রান্তে এঁটো বাসন পড়ে আছে। ছেলেটার পাঁচড়ার রস ভালো না লাগায় থেকে থেকে পাঁচড়া ত্যাগ করে কয়েকটা মাছি উড়ে যাচ্ছে এঁটো বাসনে আর উচ্ছিষ্ট ভালো না লাগায় থেকে থেকে কয়েকটা মাছি এঁটো বাসন ত্যাগ করে উড়ে এসে বসছে ছেলেটার পাঁচড়ায়।

ইতির মার ঘুম ঠিক ঘুম নয়, চোখ বুজে থাকা। মটকা মেরে নয়, শ্রান্তিতে আর দুর্বলতায়।

চোখ মেলে ইতির মা বলে, ‘ইতি এলি?’

বলে মানবের মুখের দিকে চেয়ে ইতির মা বলে, ‘সকালবেলা এক কুঁজো জল নিয়ে গেলেন, ফুরিয়ে গেছে? ইতি, যা তো মা, কুঁজোয় জল ভরে দিয়ে আয়। ওসব কি পুরুষমানুষের কাজ!’

মানব বলে, ‘সিঁড়ি ভাঙতে ইতির কষ্ট হয়, আমিই নিয়ে যেতে পারব।’

ইতির মা এ কথা শুনতে পায় না। মেয়ের পদতলে চোখ রেখে বলে, ‘তোর গায়ে রক্ত কিসের লো ইতি?’

ইতি নিশ্চিন্তভাবে বলল, ‘পাঁচড়া চুলকে ফেলেছি।’

মানব বলে, ‘তোমার পাঁচড়া হয়েছে ইতি?’

প্রশ্ন শোনবামাত্র ইতি বিনা ভূমিকায় খেপে যায়। আর্তনাদ করার মতো বলতে আরম্ভ করে, ‘হ্যাঁ হয়েছে, একশটা হয়েছে। কী করবে তুমি? ঘেন্না করবে? করগে যাও, কে তোমার ঘেন্নাকে কেয়ার করে? দেখছ না ভাইয়ের গায়ে পাঁচড়া, জান না ভাইকে আমি কোলে নিই? পাঁচড়া হবে না তো কী হবে আমার?’

তাড়াতাড়ি কুঁজোটা নামিয়ে রাখতে সেটা গড়িয়ে উঠোনে পড়ে ভেঙে যায়। মানব সেদিকে চেয়েও দেখে না।

‘ঘরে যাও ইতি, সুধাকে পাঠিয়ে দিচ্ছি।’

বলে একেবারে তিন-চারটা ধাপ ডিঙিয়ে মহামানবের মতো মানব উপরে উঠতে আরম্ভ করে।

নাম: Administrator

আমার নাম মেহেদী হাসান। আমি একজন শিক্ষার্থী। নিজে শিখতে এবং অপরকে শেখাতে ভালোবাসি।

📖
পাঠের অগ্রগতি

আপনি পড়া শুরু করেননি

০ / ০ শব্দ

বাকি: ০ শব্দ